আমরা প্রতিদিনই যানজটের কথা বলি। অফিস যেতে দেরি হয়, বাড়ি ফিরতে দেরি হয়, ছোটখাটো যানজট নিয়ে অভিযোগ থাকেই। বেঙ্গালুরু, দিল্লি, মুম্বই এই সমস্ত শহর তো যানজটের জন্যই বিখ্যাত। কিন্তু এসব যানজট নিয়ে যাঁদের নিত্যদিনের অভিযোগ, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশিদিন ধরে চলা যানজটের কাহিনি তাঁদেরও মাথা ঘুরিয়ে দেবে। শুনতে অবাস্তব লাগলেও এটি সত্যি ঘটনা। চিনের এক সড়কে তৈরি হয়েছিল এমন এক যানজট যা টানা ১২ দিন স্থায়ী ছিল। ১২ দিন ধরে রাস্তায় আটকে ছিল গাড়ির সারি। ১০০ কিলোমিটারের বেশি পথ ধরে টানা যানজট ইতিহাস রচনা করেছিল। এই পুরো পথ জুড়ে গাড়ির সারি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১২ দিন লেগে যায় যানজট ছাড়তে।
ঘটনাটি ১৯৮৭ সালের ১৪ অগাস্ট। চিনের রাজধানী বেইজিং থেকে তিব্বত পর্যন্ত বিস্তৃত ১১০ নম্বর জাতীয় সড়কে তৈরি হয়েছিল সেই ভয়াবহ যানজট। এই এক্সপ্রেসওয়েটি যত গাড়ি যাতায়াতের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেদিন তার চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি গাড়ি একসঙ্গে ওই রাস্তায় এসে পড়ে। এই বিপুল সংখ্যক গাড়ির ভিড় সামাল দেওয়ার মতো সুবিধা ওই রাস্তায় ছিল না। পরিকাঠামোই সেভাবে তৈরি ছিল না। এর মধ্যে অনেক ট্রাক ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা তৈরি হয় রাস্তার একাংশ জুড়ে মেরামতির কাজ চলায়। যার জেরে ওই এক্সপ্রেসওয়ের একাংশের ৫০ শতাংশই ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছিল না। অর্ধেক রাস্তা বন্ধ থাকার কারণে সেখানে চলাচল ছিল সংকীর্ণ। সেখান দিয়ে এই বিপুল সংখ্যক গাড়ি চলাচল করানো কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। ছোট গাড়ির পাশাপাশি অসংখ্য ট্রাক ওই পথে আটকে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও হাতের বাইরে নিয়ে যায়। ট্রাকের আকার বড় হওয়ায় সেগুলো সহজে সরানো যাচ্ছিল না। যখন রাস্তা ইতিমধ্যেই সংকীর্ণ হয়ে গেছে, তখন ট্রাকের ভিড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সেই যানজটের দৈর্ঘ্য ছিল ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি। অর্থাৎ একটানা ১০০ কিলোমিটার পথ ধরে শুধু গাড়ির সারি—যেখানে কোনও গাড়িই সরে যাওয়ার অবস্থায় ছিল না। চালক ও যাত্রীদের ১২ দিন কাটাতে হয়েছিল গাড়ির ভেতরেই। খাবার, পানি, বিশ্রাম—কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। যারা ওই পথে এসেছিলেন, তাঁদের কাছে ১২ দিন কেটেছিল অকল্পনীয় কষ্টে। অনেকে হয়তো সঙ্গে কিছু খাবার নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু তা ১২ দিনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। রাস্তার পাশে কোনও দোকান বা রেস্তোরাঁ ছিল না বললেই চলে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তেমন কোনও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ এত বড় যানজট সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা কারও ছিল না।
১২ দিন পর অবশেষে যখন যানজট কাটে, তখন বিশ্ব ইতিহাসে যোগ হয় এক নতুন অধ্যায়। এই ঘটনা আজও পৃথিবীর দীর্ঘতম যানজট হিসেবে বিবেচিত হয়। শহরের নিয়মিত যানজট কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। কিন্তু এই যানজট ১২ দিন ধরে টানা স্থায়ী হয়েছিল, যা আজও একটি অমোঘ রেকর্ড। কেউ কেউ বলেছেন, এই যানজটের সময় কিছু চালক গাড়ি ছেড়ে হেঁটে চলে যান। কেউ কেউ রাস্তার পাশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই অপেক্ষা করেছেন ধৈর্য ধরে।
এই ঘটনা সারা বিশ্বের সড়ক পরিকল্পনাবিদদের জন্য একটি শিক্ষা হয়ে আছে। পরিকাঠামো উন্নয়নের সময় ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনা না করলে পরিণতি কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা প্রমাণ করে এই যানজট। একটি সড়ক কত গাড়ি চলাচলের জন্য তৈরি হলো, সেখানে ঠিক তার চেয়ে বেশি গাড়ি এলেই সমস্যা তৈরি হয়। আর সেই সমস্যা যদি না কাটে ১২ দিনেও, তাহলে তা ইতিহাসে পরিণত হয়। এছাড়া মেরামতির কাজ চলাকালীন বিকল্প রুটের ব্যবস্থা না থাকলে কত বড় বিপর্যয় হতে পারে, তাও এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়।
বর্তমানে বিশ্বের অনেক শহরেই বড় বড় যানজট দেখা যায়। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরগুলো নিয়মিত যানজটের মুখোমুখি হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে যানজটে আটকে থাকা আজও সাধারণ ঘটনা। সম্প্রতি ভারতের বেঙ্গালুরু শহরে একদিনের যানজট নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু ১২ দিনের সেই যানজটের তুলনায় এগুলো কিছুই নয়। সেই যানজট ছিল ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন, যা প্রমাণ করে কত বড় আকারে যানজট তৈরি হতে পারে যদি পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকে।
চিন সরকার পরে ওই সড়কের উন্নয়নে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। ১১০ নম্বর জাতীয় সড়কটিকে প্রশস্ত করা হয়, আরও বেশি গাড়ি চলাচলের উপযোগী করে তোলা হয়। বিকল্প সড়ক নির্মাণ করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে এত বড় যানজট আর না ঘটে। তবে ১৯৮৭ সালের সেই ঘটনা আজও মানুষ ভোলেনি। সড়ক পরিবহন নিয়ে যেকোনো আলোচনায় এই ঘটনা উঠে আসে।
১৯৮৭ সালের সেই ১২ দিনের যানজট আজও সড়ক পরিকল্পনাবিদদের জন্য সতর্কবার্তা। একটি সড়কের ধারণক্ষমতা, বিকল্প রুটের ব্যবস্থা, জরুরি সময়ে প্রশাসনিক তৎপরতা—এসব বিষয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এই ঘটনা বারবার মনে করিয়ে দেয়। উন্নত পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতে পৃথিবীতে আর এত বড় যানজট সৃষ্টি হবে না, আশা করা যায়। তবে ১৯৮৭ সালের সেই যানজটের মতো ঘটনা ইতিহাসের পাতায় আজও অমোঘ হয়ে রয়েছে। প্রতিবার যখন আমরা যানজটে আটকে থাকি, তখন হয়তো অনেকেই মনে করেন, অন্তত ১২ দিন তো আটকে থাকতে হচ্ছে না। সেই দিক থেকে আমাদের ছোটখাটো যানজট হয়তো ততটা কষ্টের নয়।

I am Raju Das. I have been working in news and digital journalism for more than five years. I have a strong interest in covering politics and regional news. Before publishing any report, our team always conducts in-depth research and verifies the information so that we can present accurate and reliable news to our readers.
I run a news website called “Mtimes,” where we mainly publish important local and regional news. Our goal is to deliver fast, accurate, and trustworthy information to readers. That’s why we try to analyze the background and real situation behind every story and present it in simple and clear language.
Our team continuously works hard to improve the quality of our reporting and journalism.
In today’s era of digital journalism, my main goal is to provide readers with reliable, fact-based local and regional news they can trust.












