কখনও কি ভেবেছেন মানুষের ইউরিন থেকে বিয়ার তৈরি হতে পারে? শুনে অবাক লাগলেও—এই খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ঘুরে বেড়ায়। কেউ বিশ্বাস করে, কেউ ভাবে এগুলো সবই নেটের গুজব। কিন্তু আসল ব্যাপারটা কী? সত্যিই কি প্রস্রাব থেকে সরাসরি বিয়ার বানানো হয়? নাকি এর পিছনে আছে এক আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া? আজকে পুরো বিষয়টা সহজ ভাষায় খোলসা করে জানিয়ে দিচ্ছি।
গুজব নয়—বিষয়টি পুরোপুরি বিজ্ঞাননির্ভর
প্রথমেই পরিষ্কার করে বলা দরকার—সিঙ্গাপুরে NewBrew নামে যে বিয়ার তৈরি হয়, তা সরাসরি ইউরিন থেকে তৈরি নয়। তবে এতে ব্যবহৃত জল আসে এমন এক উৎস থেকে, যার মধ্যে শহরের বর্জ্যজলও থাকে। সেই বর্জ্যজলের ভেতর ইউরিন থাকলেও, সেটা এমনভাবে পরিশোধন করা হয় যে সেই জল একেবারে বিশুদ্ধ পানীয় জলে রূপান্তরিত হয়।
এই জলটিই সিঙ্গাপুরে পরিচিত NEWater নামে। আর NewBrew বানানো হয় এই পরিশোধিত পানি ব্যবহার করে।
তাহলে প্রশ্ন আসে—বর্জ্যজল কি সত্যিই পানীয় জলে রূপ নেওয়া সম্ভব? সম্ভব! সিঙ্গাপুর বহু বছর ধরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, এবং বিশ্বজুড়ে বহু বিজ্ঞানী তাদের প্রক্রিয়াকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বলে মনে করেন।
NEWater কী? সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা
একবার বুঝে নিন, NEWater আসলে কী।
এটি শহরের সংগ্রহ করা বর্জ্যজল—যার মধ্যে মানুষের ব্যবহৃত জল, ইউরিন, রান্নাঘরের জল সবই থাকে।
সেই বর্জ্যজল বিশেষ তিনটি ধাপে পরিশোধন করা হয়—মাইক্রোফিলট্রেশন, রিভার্স অসমোসিস, এবং আল্ট্রা-ভায়োলেট জীবাণুমুক্তকরণ।
প্রক্রিয়ার শেষে জল এতটাই বিশুদ্ধ হয়ে যায় যে আন্তর্জাতিক মানের পানীয় জলের থেকেও অনেক সময় পরিষ্কার হয়।
এই NEWater-ই পরে বিয়ার তৈরির মূল জল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
NewBrew কীভাবে তৈরি হয়?
বিয়ারের প্রক্রিয়া একই থাকে—মাল্ট, হপস, ইস্ট ইত্যাদি ব্যবহার করে ফারমেন্টেশন করা হয়। শুধু পানির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয় NEWater।
প্রক্রিয়াটা মোটামুটি এমন—
শহরের বর্জ্যজল সংগ্রহ
তিন-ধাপ বিশুদ্ধকরণ (ফিল্টার → RO → UV)
বিশুদ্ধ NEWater তৈরি
সেই জল দিয়ে সাধারণ বিয়ারের মতোই ব্রুইং প্রক্রিয়া
ফারমেন্টেশন শেষে বোতলজাত করা
মানে, কেউ আপনার সামনে এসে যে “ইউরিন থেকে বিয়ার বানায়”—এটা ভুল ধারণা।
এটা বেশি ঠিক বলা—পুনর্ব্যবহৃত পানি দিয়ে বিয়ার তৈরি হয়।
কেন এমন বিয়ার বানানো হয়েছে?
এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গাপুর খুব ছোট দেশ এবং সেখানে মিঠে জলের অভাব বহুদিনের সমস্যা। ভবিষ্যতে পৃথিবীতে জলের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়ছে। তাই পানি পুনর্ব্যবহারের গুরুত্ব বোঝাতে সিঙ্গাপুর সরকার এবং স্থানীয় ব্রুয়ারি ব্যতিক্রমী এই বিয়ারের ধারণা আনে।
এই NewBrew মূলত মানুষের ভুল ধারণা ভাঙতে সাহায্য করে—
“বর্জ্য হলে কী হবে, বিজ্ঞান থাকলে সেটাকেও নিরাপদ ও নতুন ভাবে ব্যবহার করা যায়।”
স্বাদ কেমন?
যারা NewBrew খেয়েছেন, তাঁরা বলেছেন—
সাধারণ লাইট বিয়ারের মতোই
টেস্টে কোনো অদ্ভুত গন্ধ বা আলাদা কিছু নেই
বরং অনেকেই বলেছেন এটা স্মুথ এবং ফ্রেশ লাগে
শুনতে যত ভয়ংকর মনে হোক, স্বাদে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই।
তবে বিতর্কও আছে
অবশ্যই, এই বিষয় নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। অনেকে মানসিকভাবে মানতে পারেন না যে বর্জ্যজল থেকে পুনর্ব্যবহৃত জল দিয়ে কিছু তৈরি হচ্ছে।
কেউ কেউ ভাবেন—এটা কি সত্যিই ১০০% নিরাপদ?
তবে বিজ্ঞানীরা বারবার পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন—NEWater সাধারণ জলের থেকেও বেশি ফিল্টারড, তাই ঝুঁকি নেই।
ভবিষ্যতের জন্য বড় বার্তা
এই উদ্যোগটি আসলে একটা শিক্ষা—
আগামী দিনে পৃথিবীর জলসম্পদ কমতে থাকলে, পুনর্ব্যবহারই হবে বাঁচার রাস্তা।
সিঙ্গাপুর আজ সেটা ব্যবহার করে দেখাচ্ছে।
আজ বিয়ার, কাল হয়তো আরও অনেক পণ্যই পুনর্ব্যবহৃত জল দিয়ে তৈরি হবে।
উপসংহার
“ইউরিন থেকে বিয়ার”—এটা শুনে যতই অদ্ভুত লাগুক, পুরো বিষয়টি আসলে আধুনিক বিজ্ঞান ও ভবিষ্যতের জলব্যবস্থাপনার একটি উদাহরণ। সরাসরি ইউরিন নয়, বরং বহুবার বিশুদ্ধ করা জল দিয়েই তৈরি হয় NewBrew।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
ডিসক্লেইমার:
মদ্যপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত বিয়ার বা অন্য কোনও অ্যালকোহল শরীরের লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্ক, গর্ভবতী নারী, ও যাঁরা নিয়মিত ওষুধ খান—তাঁদের জন্য মদ্যপান বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে সীমিত পরিমাণেই পান করুন বা একেবারে এড়িয়ে চলুন।













