সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন ভিডিওতে প্রায়ই একটি দাবি শোনা যায়—মানুষকে দাহ করার পর যে ছাই তৈরি হয়, সেই ছাইকে নাকি ২৮০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় গরম করে কার্বন বানানো হয়, আর সেই কার্বন থেকেই ট্যাটু করার কালি তৈরি করা হয়। শুনতে বিষয়টি রহস্যময় ও আবেগঘন হলেও বাস্তবে এই তথ্য কতটা সত্য, তা জানা খুবই জরুরি।
দাহের পর যে ছাই থাকে, তার প্রকৃত গঠন
মানুষকে দাহ করার সময় সাধারণত তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৮০০ থেকে ১১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই উচ্চ তাপে শরীরের সমস্ত জৈব অংশ, যেমন চামড়া, মাংস ও রক্ত সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়। এর ফলে শরীরে থাকা কার্বনও নষ্ট হয়ে যায়।
দাহশেষে যে ছাই পাওয়া যায়, তা মূলত হাড়ের খনিজ অংশ দিয়ে তৈরি। এর মধ্যে থাকে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং অন্যান্য অজৈব উপাদান। অর্থাৎ এই ছাইতে কার্যকর কার্বন প্রায় থাকেই না।
২৮০০ ডিগ্রি তাপে কার্বন বানানোর দাবি কতটা সত্য?
এই দাবিটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। কার্বন সাধারণত তৈরি হয় জৈব পদার্থকে নির্দিষ্ট পরিবেশে পোড়ানোর মাধ্যমে। কিন্তু দাহশেষের ছাই থেকে আবার নতুন করে কার্বন তৈরি করা সম্ভব নয়, যত বেশি তাপই দেওয়া হোক না কেন। ২৮০০ ডিগ্রি তাপমাত্রা শিল্পক্ষেত্রে গ্রাফাইট বা বিশেষ ধাতু প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত হয়, মানুষের দাহশেষ থেকে কার্বন বানানোর জন্য নয়।
তাহলে মেমোরিয়াল ট্যাটু ইঙ্ক কীভাবে তৈরি হয়?
এখানেই আসে আসল সত্য। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে মানুষের দাহশেষ ব্যবহার করে মেমোরিয়াল ট্যাটু তৈরি করা হয়েছে। তবে এই ছাই ট্যাটু কালির মূল উপাদান নয়।
এই প্রক্রিয়ায় দাহশেষ থেকে খুব অল্প পরিমাণ ছাই নেওয়া হয়। সেই ছাইকে একাধিক ধাপে পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম কণায় রূপান্তর করা হয়। এরপর এই পরিশোধিত কণাগুলো নিরাপদ মেডিক্যাল-গ্রেড ট্যাটু ইঙ্কের সঙ্গে প্রতীকীভাবে মেশানো হয়।
ট্যাটু করার সময় যে কালিটি আসলে ত্বকে ঢোকে, সেটি মূলত নিরাপদ কার্বন ব্ল্যাক ইঙ্ক। দাহশেষ সেখানে শুধুই স্মৃতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
নিরাপত্তা ও বাস্তবতা
এই ধরনের ট্যাটু তৈরি করা খুবই সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সঠিক জীবাণুমুক্তকরণ না হলে ত্বকে সংক্রমণ বা অন্যান্য সমস্যা হতে পারে। তাই এটি ঘরে বসে বা সাধারণ ট্যাটু শপে করা উচিত নয়।
উপসংহার
মানুষকে দাহ করার পর যে ছাই পাওয়া যায়, সেখান থেকে সরাসরি কার্বন তৈরি করে ট্যাটু ইঙ্ক বানানো হয়—এই ধারণাটি মূলত গুজব ও ভুল তথ্যের ফল। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে দাহশেষকে সম্মান ও স্মৃতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে মেমোরিয়াল ট্যাটু তৈরি করা হয়েছে, যা আবেগের সঙ্গে যুক্ত হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। তাই এই ধরনের তথ্য দেখলে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতা জানা খুবই জরুরি।













