রাস্তায় বেরোলে অনেক সময়ই দেখা যায়, ট্রাফিক পুলিশ বাইক থামিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষা করছে। খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু মানুষ অভিযোগ করেন—“পুলিশ আমার বাইকের চাবি খুলে নিয়ে গেল।” সত্যিই কি পুলিশের এমন অধিকার আছে? আর যদি না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কী করবে? এই বিষয়গুলো নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে, তাই আজ সব কিছু একেবারে সহজ ভাষায় পরিষ্কার করে দেওয়া হলো।
পুলিশ কি বাইকের চাবি নিয়ে নিতে পারে?
সরাসরি উত্তর—না, ট্রাফিক পুলিশ আপনার বাইকের চাবি নিজের ইচ্ছামতো খুলে নিতে পারে না।
ট্রাফিক আইন অনুযায়ী, পুলিশ নিয়ম ভাঙার তথ্য পেলে গাড়ি জব্দ করতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা চাবি কেড়ে নিয়ে আপনাকে অসুবিধায় ফেলবে। অনেক সময় ড্রাইভারকে ভয় দেখাতে গিয়ে বা গাড়ি থামানো নিশ্চিত করতে কিছু পুলিশ চাবি বের করে নেয়, কিন্তু এটি সঠিক পদ্ধতি নয়।
গাড়ি জব্দ করার জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে—রসিদ দেওয়া, কারণ লেখা, ডকুমেন্ট নথিভুক্ত করা। তাই চাবি নিয়ে নেওয়া কোনো অনুমোদিত নিয়ম নয়।
যদি পুলিশ চাবি নিয়ে নেয়, তখন কী করবেন?
এই পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। বরং ঠাণ্ডা মাথায় নিচের কাজগুলো করুন—
শান্ত থাকুন এবং কথা বলুন ভদ্রভাবে।
রাস্তায় তর্কে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।অফিসারের নাম ও ব্যাজ নম্বর জেনে নিন।
আইন অনুযায়ী পুলিশকে নিজের পরিচয় জানাতে হয়।ইউনিফর্ম আছে কি না দেখে নিন।
ইউনিফর্ম ছাড়া পুলিশ সাধারণত চেকিং করতে পারে না।ঘটনার ভিডিও বা ছবি তুলুন।
ভবিষ্যতে অভিযোগ জানাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হবে।প্রয়োজনে ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমে ফোন করতে পারেন।
যদি মনে হয় পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে আপনাকে হয়রানি করছে, তাহলে পরবর্তীতে থানায় বা ট্রাফিক বিভাগের অফিসে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে পারেন।
পুলিশ কি ইউনিফর্ম ছাড়া চালান কাটতে পারে?
এটি সাধারণ মানুষের মনে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি।
সাধারণত চালান কাটার সময় পুলিশকে ইউনিফর্মে থাকতে হয়।
ইউনিফর্ম ছাড়া থানার সাধারণ স্টাফ বা অন্য কোনো ব্যক্তি এসে “চালান দেবেন” বললে তা সন্দেহজনক।
আপনি সেক্ষেত্রে নিচের কাজগুলো করতে পারেন—
প্রথমে আইডি কার্ড দেখতে বলুন
পরিচয় যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনো কাগজপত্রের কপি বা টাকা দেবেন না
যদি কেউ আপনার আপত্তি সত্ত্বেও চালান কাটতে থাকে, আপনি পরে পুলিশ কমিশনার অফিসে বা সাইবার গ্রিভ্যান্স সেল-এ অভিযোগ করতে পারবেন।
একজন ট্রাফিক কনস্টেবল সর্বোচ্চ কত টাকার চালান কাটতে পারে?
অনেকেই মনে করেন কনস্টেবল ইচ্ছেমতো টাকা জরিমানা নিতে পারে। আসলে তা নয়।
ফাইন বা জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করা থাকে মোটর ভেহিকেল অ্যাক্ট এবং রাজ্য সরকারের নোটিফিকেশন অনুযায়ী।
অর্থাৎ—
কনস্টেবল নিজে থেকে জরিমানা বাড়াতে বা কমাতে পারে না
প্রত্যেক অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট জরিমানার পরিমাণ থাকে
গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ প্রয়োজন হয়
ট্রাফিক কনস্টেবল কেবলমাত্র spot challan করতে পারে—যেখানে জরিমানা আগেই নির্ধারিত থাকে। তাই কেউ যদি “ইচ্ছেমতো” টাকা চাইতে শুরু করে, তা বুঝতে হবে বেআইনি।
কখন আপনি অভিযোগ করবেন?
যদি নিচের কোনো ঘটনা ঘটে, তখন অভিযোগ করা আপনার অধিকার—
পুলিশ চাবি কেড়ে নেয় বা ইচ্ছাকৃত হয়রানি করে
পরিচয় দেখাতে না চাইলেও জোর করে কাগজপত্র চায়
ইউনিফর্ম ছাড়া চালান কাটে
নির্ধারিত ফাইন-এর বাইরে টাকা দাবি করে
দুর্ব্যবহার বা হুমকি দেয়
অভিযোগ করার জায়গা—
নিকটবর্তী ট্রাফিক পুলিশ স্টেশন
জেলা পুলিশ কন্ট্রোল রুম
স্টেট ট্রাফিক বিভাগের গ্রিভ্যান্স সেল
পাবলিক গ্রিভ্যান্স পোর্টাল
অভিযোগ করার সময় ঘটনাস্থলের ভিডিও, ছবি বা সময়–তারিখ উল্লেখ করতে ভুলবেন না।
উপসংহার
ট্রাফিক পুলিশের কাজ আমাদের নিরাপদ রাখা। কিন্তু আইন যেমন পুলিশের অধিকার দিয়েছে, তেমনি সাধারণ নাগরিকেরও নিজের সুরক্ষা ও সম্মানের অধিকার আছে। তাই—
সঠিক কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন
নিয়ম মেনে চলুন
এবং যদি কোনো অন্যায় আচরণ দেখেন, নির্ভয়ে অভিযোগ করুন
সচেতন নাগরিক মানেই নিরাপদ রাস্তাঘাট।













