আজকাল আমরা সাজগোজে লিপস্টিক ব্যবহার করি খুবই স্বাভাবিকভাবে। বাজারে হাজার রকমের শেড পাওয়া যায়—লাল, গোলাপি, নুড, ম্যারুন, যাই বলুন। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, লিপস্টিকের অনেক রঙ তৈরি হয় এমন এক উৎস থেকে যেটা শুনলে অনেকেই চমকে উঠবেন। সেই উৎস হলো ক্যাকটাস গাছে জন্মানো ক্ষুদ্র পোকা, যাকে বাংলায় অনেকে “মরা পোকা” বা ফাঙ্গাস বলে উল্লেখ করেন।
এখন প্রশ্ন হলো—কেন একটি প্রসাধনী পণ্যে মরা পোকার ব্যবহার? আর লিপস্টিক তৈরির আসল প্রক্রিয়াই–বা কী? আজ সেই অজানা গল্পটাই খুব সহজ ভাষায় তুলে ধরছি।
ক্যাকটাসের ওপর জন্মানো যে পোকা, লিপস্টিকের রঙ তৈরি হয় তার থেকেই
মেক্সিকো ও পেরু অঞ্চলে ক্যাকটাস গাছে জন্মায় ছোট্ট সাদা-লাল রঙের পোকা, যার নাম কোকিনিয়াল। এদের শরীরের ভেতর এমন এক প্রাকৃতিক রঙ থাকে, যেটি শুকিয়ে গুঁড়ো বানালে তৈরি হয় গভীর লাল রঙ—কারমাইন। এই কারমাইনই লিপস্টিক বা রুজের মতো কসমেটিকের জায়গায় ব্যবহৃত হয় বহু দশক ধরে।
এই পোকাগুলিকে সংগ্রহ করে প্রথমে শুকানো হয়, পরে গুঁড়ো করা হয়। প্রতি হাজার হাজার পোকা থেকে মাত্র কিছু গ্রামের রঙ পাওয়া যায়। তাই এটা দামী, কিন্তু খুবই টেকসই এবং রঙ উজ্জ্বল থাকে দীর্ঘসময়।
কেন কোম্পানিগুলো এই মরা পোকার রঙ ব্যবহার করে?
এটা অনেকের কাছে অদ্ভুত লাগলেও কোম্পানিগুলোর কাছে এটি একেবারে যৌক্তিক কারণ—
রঙ খুব শক্তিশালী ও স্থায়ী
লাল লিপস্টিকের গভীর শেড তৈরি করতে কারমাইনের মতো রঙ খুব কম পাওয়া যায়।ত্বকে কম অ্যালার্জি হয়
বহু কেমিক্যাল রঙে ত্বকের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, কিন্তু কারমাইন তুলনামূলক নিরাপদ।প্রাকৃতিক উৎস হওয়ায় রঙ টিকে থাকে দীর্ঘসময়
একবার ঠোঁটে লাগলে সহজে ফিকে হয় না।
তাই বাজারে বেশিরভাগ লাল ও ম্যারুন শেডের লিপস্টিকে এই রঙই থাকে।
লিপস্টিক তৈরিতে যে উপাদানগুলো লাগে
একটি লিপস্টিকের ভিত গড়ে ওঠে কয়েকটি উপাদান মিশিয়ে—
মোম
বিভিন্ন ধরনের তেল
শিয়া বাটার বা কোকো বাটার
রঙ
সুগন্ধি
প্রিজারভেটিভ
এই সবকিছুর মিশ্রণই চূড়ান্ত লিপস্টিক।
লিপস্টিক তৈরির ধাপ—যেভাবে তৈরি হয় আপনার প্রিয় শেডটি
১. প্রথমে মোম ও তেল গরম করা হয়
বড় পাত্রে গরম করা হয় মোম, বাটার ও বিভিন্ন তেল। ধীরে ধীরে সব গলে গিয়ে এক ধরনের নরম তরল তৈরি হয়।
২. এবার যোগ করা হয় রঙ
গলানো মিশ্রণে যুক্ত করা হয় পিগমেন্ট।
এখানেই ব্যবহৃত হয় কোকিনিয়াল পাউডার বা কারমাইন—যদি লাল শেড তৈরি করতে হয়।
৩. সব উপাদান ভালোভাবে মিশিয়ে নেওয়া হয়
গরম অবস্থায় রঙ ও বেস ভালোভাবে মেশানো হয়, যাতে কোনো দানা না থাকে এবং রঙ সমানভাবে ছড়িয়ে যায়।
৪. লিপস্টিক ছাঁচে ঢেলে ঠান্ডা করা হয়
গরম মিশ্রণ ছাঁচে ঢেলে দেওয়া হয়। ঠান্ডা হতে হতে সেটা শক্ত হয়ে যায়।
৫. লিপস্টিক বের করে ফিনিশিং দেওয়া হয়
ছাঁচ থেকে বের করা লিপস্টিককে মসৃণ করা হয় এবং প্যাকিং টিউবে সেট করা হয়।
৬. বাজারে বিক্রির জন্য প্রস্তুত
শেষে সুন্দর প্যাকেটিং করে দোকানে পাঠানো হয়।
পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে করা হয়, যাতে শেড নিখুঁত হয় এবং ঠোঁটে লাগালে টিকেও থাকে।
মানুষের জানা উচিত—সব লিপস্টিক একইভাবে তৈরি নয়
আজকাল অনেক কোম্পানি ভেগান কসমেটিক তৈরি করে, সেগুলোতে কোকিনিয়াল ব্যবহার করা হয় না। সেখানে কেমিক্যাল বা প্ল্যান্ট-বেসড রঙ ব্যবহার হয়।
তাই আপনি যদি ভেগান পণ্য ব্যবহার করতে চান, তবে লিপস্টিকের গায়ে লেখা থাকে—
Vegan
Cruelty-Free
বা উপাদান তালিকায় Carmine, E120, Cochineal Extract নেই
তাহলেই বুঝবেন মরা পোকার রঙ নেই।
উপসংহার
আমরা সাজগোজে যে লিপস্টিক ব্যবহার করি, তার পেছনে কতটা বিজ্ঞান, প্রকৃতি আর পরিশ্রম লুকিয়ে থাকে—তা অনেকেই জানেন না। কোকিনিয়াল দিয়ে লিপস্টিক বানানো মানুষের কাছে অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু বহু বছর ধরে এটি একটি নিরাপদ, প্রাকৃতিক রঙ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
যারা ভেগান, তারা অন্য বিকল্প বেছে নিতে পারেন। আর যারা প্রাকৃতিক ও গভীর রঙ পছন্দ করেন, তাদের জন্য কারমাইন এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয়।













