শীত কিংবা গরম—কোনো ঋতুতেই সাপের উপদ্রবকে হালকা করে দেখা যায় না। অনেক সময় রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন আশেপাশে ঝোপঝাড় বা পুরোনো বাড়ি থাকলে অজান্তেই সাপ ঘরে ঢুকে পড়ে। সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থা হয় তখন, যখন সাপ সরাসরি মানুষের শরীরের উপর উঠে যায়। সে মুহূর্তে আতঙ্কে ভুল পদক্ষেপ নিলে বিপদ আরও বড় হতে পারে। তাহলে এমন ঘটনা ঘটলে কীভাবে মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি সামলাতে হবে, চলুন জেনে নেওয়া যাক।
গায়ে সাপ উঠে গেলে প্রথম করণীয় কী?
সাপ সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করতে আসে না। ভয় পেলে সে কামড় দেয়। তাই শরীরের উপর সাপ উঠলে সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি হল নিজেকে স্থির রাখা।
১. নড়াচড়া করবেন না
যত কঠিনই হোক, শরীর যতটা সম্ভব স্থির রাখতে হবে। হাত-পা ঝাঁকালে সাপ ভয় পেয়ে কামড় দিতে পারে।
২. আস্তে করে শ্বাস নিন
গভীর নিঃশ্বাস বা জোরে শ্বাস নিলে শরীর নড়ে যায়। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখলে সাপও শান্ত থাকে।
৩. খুব আস্তে অন্য কাউকে ডাকুন
আশেপাশে কেউ থাকলে ফিসফিস করে ডাকতে পারেন। হঠাৎ জোরে ডাকাডাকি বা আলো জ্বালানো উচিত নয়।
৪. সাপকে নিজে থেকে নেমে যেতে দিন
তাকে খোঁচা দেওয়া, লাঠি বা ঝাঁটা দিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা ভুলের নামান্তর। সে নিজে থেকেই বেরোনোর পথ খুঁজে নেবে।
৫. সাপ নেমে গেলে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় যান
সাপ দূরে গেলে আস্তে করে উঠে ঘর পরিবর্তন করুন। দরজা বন্ধ করুন যেন সে আবার ঘরে না ঢোকে।
৬. সঙ্গে সঙ্গে ফরেস্ট বিভাগের সাহায্য নিন
ভারত সরকারের বন দপ্তরের হেল্পলাইন নম্বর হলো:
📞 1926
এই নম্বরে ফোন করলে প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারী দল এসে নিরাপদে সাপটিকে ধরবে।
ঘরে সাপ দেখা দিলে কী করবেন?
চিৎকার বা জোরে শব্দ করবেন না
বাচ্চা ও পোষা প্রাণীকে দূরে রাখুন
সাপকে মারার চেষ্টা করবেন না
তাকে কোণঠাসা করবেন না
দরজা-জানালা আস্তে করে বন্ধ করুন যেন সে বাইরে না পালায়
উপরোক্ত 1926 নম্বরে সাহায্য চান
সাপ মারলে তা আইনত অপরাধ এবং পরিবেশের বড় ক্ষতি করে, কারণ সাপ ইঁদুর-ঝিঁঝিঁপোকা খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
সাপে কামড়ালে কী করবেন?
অনেকেই মনে করেন সাপে কামড়ালে আর বাঁচার উপায় নেই। আসলে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা পেলে বেশিরভাগ মানুষই সুস্থ হয়ে ওঠেন।
১. শান্ত থাকুন
আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি করলে বিষ শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
২. কামড়ের জায়গা নড়াচড়া বন্ধ করুন
যে অঙ্গে কামড়েছে, সেটিকে যতটা সম্ভব স্থির রাখুন।
৩. দড়ি বা কাপড় দিয়ে শক্ত বেঁধে রাখবেন না
অনেকে ভুল করে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেন, এতে অঙ্গ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৪. বরফ লাগাবেন না, কেটে বিষ বের করার চেষ্টা করবেন না
এসব করলে ক্ষতি আরও বাড়ে।
৫. সাপটিকে ধরতে যাবেন না
প্রাণের ঝুঁকি বাড়ে। শুধু রঙ বা চিহ্ন মনে রাখার চেষ্টা করুন, ডাক্তারকে বললে সুবিধা হবে।
৬. দ্রুত হাসপাতালে যান
অ্যান্টি-ভেনম দেওয়াই একমাত্র সঠিক চিকিৎসা। তাই সময় নষ্ট না করে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে যান।
বাড়িতে সাপ ঢোকে কেন?
আশেপাশে ঝোপঝাড় বা নোংরা জায়গা
বাড়িতে ইঁদুর থাকা
ভেজা, অন্ধকার বা ফাঁকা কোণ
বাড়ির গর্ত বা চিলেকোঠা খোলা থাকা
বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা ও গর্ত বন্ধ করা সাপ ঢোকার সম্ভাবনা অনেক কমিয়ে দেয়।
কেন সবাইকে এই তথ্য জানা জরুরি?
সাপ নিয়ে অজ্ঞতা বা ভুল ধারণা বহু দুর্ঘটনার মূল কারণ। ভয় পেয়ে ভুল পদক্ষেপ নিলে জীবনহানি পর্যন্ত হতে পারে। তাই—
✔ শান্ত থাকা
✔ সঠিক আচরণ
✔ সময়মতো চিকিৎসা
✔ এবং সরকারি বন দপ্তরের সাহায্য নেওয়া
—এই চারটি বিষয় জানলেই বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব।
এই সচেতনতা শুধু নিজের নয়, পরিবারের ও আশেপাশের মানুষের জীবনও বাঁচাতে পারে। মনে রাখবেন—জ্ঞানই নিরাপত্তা, আর সাপে ওঠা বা কামড়ানোর পরিস্থিতিতে ঠান্ডা মাথায় সঠিক সিদ্ধান্তই জীবন রক্ষা করতে পারে।













