গত কিছুদিন ধরে আমরা সবাই একটা খবর বারবার শুনছি—ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার দাম কমে যাচ্ছে। আর এবার তো টাকা নতুন এক রেকর্ডে নেমে গেছে। বাজারে এখন এক ডলারের জন্য প্রায় ৯০ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে। বিষয়টি শুধু সংবাদ নয়—এটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—হঠাৎ টাকার দাম এত কমছে কেন? আর এর ফলে সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব পড়ছে? চলুন খুব সহজ ভাষায় সবটা বোঝার চেষ্টা করি।
কেন টাকা এতটা পড়ে গেল?
১. বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া
বিদেশি বড় বড় কোম্পানি যখন শেয়ারবাজারে টাকা বিনিয়োগ করে, তখন দেশের ভেতরে ডলারের প্রবাহ বাড়ে। এতে টাকার দাম স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু কয়েক মাস ধরে তারা বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে, ফলে ডলারের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তাই টাকার দাম আরও নিচে নেমে যাচ্ছে।
২. আমদানি বেশি, রফতানি কম
ভারত অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস—যেমন পেট্রোল, ডিজেল, খনিজ তেল, নানা ধরনের মেশিন—বিদেশ থেকে আনে। এগুলো সবই ডলারে কিনতে হয়। বাজারে ডলারের চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ কম, তাই টাকার দাম কমে যাচ্ছে।
৩. বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, রাজনৈতিক উত্তেজনা, তেলের দাম বৃদ্ধি—এসব কারণে ডলারের দাম বেশি উঠে যায়। এর ফলে ভারতসহ অনেক দেশের মুদ্রা দুর্বল হয়ে পড়ে।
৪. বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা
কয়েকটি দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি ঝুলে থাকার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে চাইছে না। বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় টাকার ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
টাকার দাম কমলে সাধারণ মানুষের কী সমস্যা?
অনেকে ভাবেন—টাকা কমা মানে এটা সরকারের দায়। কিন্তু আসলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষেরই ওপর।
♦ দৈনন্দিন জিনিসের দাম বাড়বে
বিদেশ থেকে যেসব জিনিস আসে—মোবাইল, ল্যাপটপ, গাড়ির যন্ত্রাংশ, ক্যামেরা, এমনকি কিছু খাবার—সব কিছুরই দাম বাড়বে।
♦ পেট্রোল-ডিজেল আরও দামী হতে পারে
তেল আমদানি ডলারে হয়। ডলারের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে। এতে সব ধরনের জিনিসপত্রের দামও বাড়তে থাকে।
♦ বিদেশ ভ্রমণ ও পড়াশোনায় অতিরিক্ত খরচ
বিদেশে পড়তে যাওয়া ছাত্রছাত্রী এবং ভ্রমণকারীদের খরচ অনেকটাই বেড়ে যাবে। কারণ তাদের টিউশন ফি, থাকার খরচ—সব ডলারে হিসেব হয়।
♦ ব্যবসায়ী ও ছোট শিল্পেরও সমস্যা
যেসব ব্যবসা বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, তাদের খরচ হঠাৎই বাড়তে শুরু করবে। ছোট ব্যবসায় এটার প্রভাব আরও বেশি।
RBI কি করছে?
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক RBI নিয়মিত বাজারে হস্তক্ষেপ করে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তারা মাঝে মাঝে ডলার বিক্রি করে বাজারে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে। তবে আন্তর্জাতিক বিষয়, আমদানি-রফতানি ঘাটতি এবং বৈশ্বিক চাপের কারণে অনেক সময় তাদের পক্ষে ঠিকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না।
আমাদের কী করা উচিত?
● অপ্রয়োজনীয় বিদেশি পণ্য কেনা কমানো
● যতটা সম্ভব দেশি পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো
● নিজের খরচ একটু পরিকল্পনা করে করা
● বিদেশ ভ্রমণ বা কোর্সের ক্ষেত্রে আগে থেকেই খরচ যাচাই করা
Conclusion
টাকার দাম কমার ঘটনা একদিনে ঘটে না—এটি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ও বৈশ্বিক উত্তেজনার মিলিত ফল। তবে ভারতের অর্থনীতি শক্তিশালী, আর পরিস্থিতি বদলাতেই পারে। আমাদের শুধু সচেতন থাকতে হবে, খরচ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে করতে হবে এবং যতটা সম্ভব দেশীয় পণ্যের দিকে ঝুঁকতে হবে।
দেশ নিজের উৎপাদন বাড়াতে পারলে এবং সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিলে টাকার দাম আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।













